কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে যখন অর্জুন বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং নিজের আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে দ্বিধা করেন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কর্ম, ধর্ম এবং আত্মার অবিনশ্বরতা নিয়ে যে শিক্ষা দেন, তা-ই শ্রীকৃষ্ণের বাণী।
১. কর্ম ও ফলাফলের ওপর উপদেশ
শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে বিখ্যাত বাণী হলো কর্মফল ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করা।
“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।” অর্থাৎ, তোমার অধিকার কেবল কর্ম করার ওপর, কর্মের ফলের ওপর নয়। ফলের আশা ত্যাগ করে তুমি তোমার কর্তব্য পালন করো। সফল হওয়ার দুশ্চিন্তা বা ব্যর্থ হওয়ার ভয় যেন তোমার কর্মকে বাধাগ্রস্ত না করে।
২. আত্মার অবিনশ্বরতা
অর্জুন যখন হত্যার পাপে ভীত ছিলেন, তখন কৃষ্ণ বলেন:
"আত্মা অবিনশ্বর। একে শস্ত্র কাটতে পারে না, আগুন পোড়াতে পারে না, জল ভেজাতে পারে না এবং বায়ু শুকিয়ে দিতে পারে না। মানুষ যেমন পুরনো বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমনি পুরনো শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীরে প্রবেশ করে।"
৩. ধর্মের গ্লানি ও অবতার তত্ত্ব
যুগে যুগে যখনই পৃথিবীতে অধর্ম বৃদ্ধি পায়, তখনই ভগবান স্বয়ং অবতীর্ণ হন। কৃষ্ণের সেই কালজয়ী বাণী:
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।” অর্থাৎ, যখনই ধর্মের পতন ঘটে এবং অধর্মের উত্থান হয়, তখনই আমি সাধুদের রক্ষা করতে, দুষ্টদের বিনাশ করতে এবং ধর্ম পুনরায় স্থাপন করতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই।
৪. রাগ ও মোহ থেকে মুক্তি
শ্রীকৃষ্ণ মানুষের পতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:
"অতিরিক্ত কাম, ক্রোধ এবং লোভ—এই তিনটি হলো নরকের দ্বার। ক্রোধ থেকে মোহের সৃষ্টি হয়, মোহ থেকে স্মৃতিভ্রম ঘটে, আর বুদ্ধিনাশ হলে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য।" তাই বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা।
৫. বিশ্বাস ও ভক্তি
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মানুষ যেভাবে তাঁকে ডাকে, তিনি সেভাবেই তাকে সাড়া দেন।
"যে আমাকে যেভাবে ভজনা করে, আমি তাকে সেভাবেই অনুগ্রহ করি। মানুষ যে পথেই চলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত সবাই আমার কাছেই আসে। ভক্তি ও শুদ্ধ মনে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার কাছেই থাকব।"
৬. স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়ার উপদেশ
সুখ ও দুঃখে বিচলিত না হওয়ার উপদেশ দিয়ে কৃষ্ণ বলেন:
"সুখ এবং দুঃখ ঋতু পরিবর্তনের মতো ক্ষণস্থায়ী। এগুলো ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে আসে এবং চলেও যায়। যে ব্যক্তি সুখ এবং দুঃখে সমান অবিচলিত থাকেন, তিনিই অমৃত লাভের যোগ্য হন।"
৭. অহংকার ত্যাগ ও শরণাগতি
শ্রীকৃষ্ণের শেষ ও পরম উপদেশ হলো সমস্ত ধর্ম ত্যাগ করে পরমাত্মার শরণাপন্ন হওয়া।
“সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।” অর্থাৎ, সমস্ত লৌকিক ধর্ম বা চিন্তা ত্যাগ করে একমাত্র আমার শরণ গ্রহণ করো। আমি তোমাকে সব পাপ থেকে মুক্ত করব। শোক করো না।
শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের মূল শিক্ষা (এক নজরে):
বিপদে ধৈর্য ধরো: জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিচলিত না হয়ে স্থির থাকা।
কর্তব্য পালন: ফল কী হবে তা না ভেবে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করা।
সত্যের পক্ষ নেওয়া: আত্মীয় হলেও যদি কেউ অধর্মের পথে চলে, তবে সত্যের খাতিরে তাকে ত্যাগ করা বা তার বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত।
মন নিয়ন্ত্রণ: যার মন তার বশে নেই, তার মনই তার সবচেয়ে বড় শত্রু। আর যার মন তার বশে, মনই তার পরম বন্ধু।
উপসংহার
মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের উপদেশগুলো কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন। যখনই কোনো মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে বা মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়, শ্রীকৃষ্ণের এই বাণী তাকে মানসিক শক্তি জোগায় এবং সঠিক পথ চিনিয়ে দেয়।

0 Comments
লেখাটি আপনার কেমন লেগেছে অনুগ্রহ করে কমেন্ট করে জানাবেন।
আমাদের ওয়েবসাইটে আপনাকে স্বাগতম। আপনিও আপনার জানা বা দেখা যে কোন ওইতিহাসিক-ভ্রমন স্থান সম্পর্কে অথবা আপনার লেখা কবিতা পাঠান আর আমাদের গান ও কবিতা ঘরের সদস্য হয়ে যান। ধন্যবাদ- all-banglakobita.com (ক্লিক করুন -আপনার লেখা)