Advertisement

বাংলাদেশের আইটি এবং সফটওয়্যার খাতের বিবর্তন: একটি নীরব বিপ্লব

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাত গত দুই দশকে যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, তাকে অনায়াসেই একটি 'নীরব বিপ্লব' হিসেবে অভিহিত করা যায়। নব্বইয়ের দশকে গুটিকয়েক কম্পিউটারের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১. শুরুর দিক এবং ডেস্কটপ যুগ (১৯৯০ - ২০০০)

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে কম্পিউটারের ব্যবহার সীমিত পরিসরে শুরু হয়। তখন মূলত টাইপিং এবং ডেটা এন্ট্রির কাজে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতো। ১৯৯৬ সালে শুল্কমুক্ত কম্পিউটার আমদানির সুযোগ করে দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে প্রযুক্তি আসতে শুরু করে। এই সময়েই দেশের প্রথম সারির কিছু সফটওয়্যার কোম্পানি (যেমন: বেসিস-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো) যাত্রা শুরু করে।

২. ইন্টারনেট সংযোগ ও আউটসোর্সিংয়ের উত্থান (২০০১ - ২০১০)

২০০৬ সালে বাংলাদেশ প্রথম সাবমেরিন ক্যাবল (SEA-ME-WE 4) এর সাথে যুক্ত হয়। এটি ছিল দেশের আইটি খাতের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধি এবং খরচ কমে আসায় তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ওডেস্ক (বর্তমানে আপওয়ার্ক) এবং ফ্রিল্যান্সার ডটকমের মতো প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল হতে থাকে।

৩. ডিজিটাল বাংলাদেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন (২০১১ - ২০২০)

২০০৮ সালে ঘোষিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ভিশন আইটি খাতকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেয়। এই সময়ে কয়েকটি বড় পরিবর্তন ঘটে:

  • হাই-টেক পার্ক: কালিয়াকৈরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ২৮টিরও বেশি হাই-টেক পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

  • সফটওয়্যার রপ্তানি: বাংলাদেশ থেকে সফটওয়্যার রপ্তানি বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জাপান আমাদের প্রধান বাজারে পরিণত হয়।

  • মোবাইল ব্যাংকিং: বিকাশ, রকেটের মতো এমএফএস (MFS) সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রযুক্তি পৌঁছে যায়, যা আইটি ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করে।

৪. বর্তমান অবস্থা: ফিনিটেক, এডুটেক এবং ই-কমার্স (২০২১ - বর্তমান)

বর্তমানে বাংলাদেশ কেবল সার্ভিস প্রোভাইডার নয়, বরং নিজস্ব প্রোডাক্ট তৈরির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

  • স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: বাংলাদেশে এখন ২৫০০-এর বেশি স্টার্টআপ কাজ করছে। রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স (যেমন: চালডাল, দারাজ) এবং এডুটেক (১০ মিনিট স্কুল) খাতগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনেছে।

  • সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি: বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০০০-এর বেশি নিবন্ধিত আইটি কোম্পানি রয়েছে। ব্যাংকিং সফটওয়্যার, ইআরপি (ERP) এবং মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে দেশি কোম্পানিগুলো এখন বিদেশি সফটওয়্যারের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।

৫. রপ্তানি আয় ও গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট

বর্তমানে আইটি খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে এই আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। বাংলাদেশের তরুণরা এখন সিলিকন ভ্যালি, গুগল, ফেসবুক এবং মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে শুধু কাজই করছে না, বরং নেতৃত্বের পর্যায়েও পৌঁছে যাচ্ছে।




৬. আগামীর সম্ভাবনা: ৪আইআর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বিবর্তনের পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR) মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে। এখনকার কোম্পানিগুলো ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ব্লকচেইন নিয়ে গবেষণা করছে। বাংলাদেশের নিজস্ব চ্যাটবট বা এআই চালিত সমাধানগুলো আগামীতে বিশ্ববাজারে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।


Post a Comment

0 Comments